১. ঐতিহাসিক ও তথ্যগতভাবে সত্য যে, মেজর জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ ১৯৭১ সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে মুজিবনগর সরকারের অধীনে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। 'একটি জাতির জন্ম' জিয়াউর রহমান লিখেছেন, 'তারপর এলো ১লা মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহ্বানে সারা দেশে শুরু হলো ব্যাপক অসহযোগ আন্দোলন।' তিনি লিখেছেন : '৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগনাল বলে মনে হলো।' জিয়ার কাছে বঙ্গবন্ধু ছিলেন জাতির পিতা।
২. মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনীতে অসদাচরণের অভিযোগে কমপক্ষে তিনবার বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ প্রধান সেনাপতির এই সুপারিশ অগ্রাহ্য করেন। বঙ্গবন্ধু জেনারেল ওসমানীর আপত্তি সত্ত্বেও মেজর জিয়াকে মেজর জেনারেল পদে পদায়ন করেন এবং ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফের দায়িত্ব প্রদান করেন। ৩. জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। ওই সময় তিনি চৈনিকপন্থি নেতা মশিউর রহমান জাদু মিয়ার সঙ্গে দেখা করেন এবং রাজনৈতিক আলোচনা করেন। সেদিক থেকে উগ্র বাম ঘরানার দল উপদলের সঙ্গে দূরবর্তী যোগাযোগ রাখতেন। এ সম্পর্কে সাম্যবাদী দলের নেতা তোয়াহা সাহেবের বক্তব্য, বিবৃতি ও আলোচনায় প্রমাণিত। ৪. দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জেনারেল ওসমানী ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তাকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বরখাস্ত করার সুপারিশ করেন। বঙ্গবন্ধু তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বরখাস্ত করলেও বাকিদের স্বপদে রেখে দেন। তিনি কর্নেল তাহেরকে অবসর দান করলেও তাকে নারায়ণগঞ্জের ড্রেজার অর্গানাইজেশনের পরিচালক পদে নিয়োগ দান করেন। কর্নেল তাহের বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাস করতেন। সে লক্ষ্যে তিনি গণবাহিনী গঠন করেন। জেড ফোর্সের অধীনে জিয়ার কমান্ডে কাজ করার ফলে তাদের ভেতরে সখ্য ও যোগাযোগ ছিল। ৫. ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ ফারুক রহমান মুজিব সরকার উৎখাত পরিকল্পনায় জিয়াউর রহমানকে অবগত করলে জিয়া বলেছিলেন, 'আমরা সিনিয়র অফিসার এরূপ কাজে জড়িত হতে পারি না, তোমরা জুনিয়র অফিসার চাইলে এগিয়ে যেতে পার।' এ সম্পর্কে তদানীন্তন ডিজিএফআইর প্রধান আবদুর রউফ বঙ্গবন্ধুকে জানিয়েছিলেন। ৬. অন্যদিকে জেনারেল ওসমানী, মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ ও ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, সামরিক বাহিনীতে দ্বৈত নেতৃত্ব থাকলে শৃঙ্খলা থাকে না। জিয়াকে সামরিক বাহিনী থেকে সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। জিয়াউর রহমানকে পূর্ব জার্মানিতে রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৭. জিয়াউর রহমান বিষয়টি জানতে পেরে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিশেষ করে আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদের কাছে ধরনা দেন এবং বিভিন্ন দিক থেকে তিনি যাতে সেনাবাহিনীতে থাকতে পারেন তার জন্য ব্যাপক লবিং শুরু করেন। তোফায়েল আহমেদ সে সময় ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বিশেষ সহকারী। তার বাড়িতে জিয়াউর রহমান বারবার গিয়ে সামরিক বাহিনীতে থাকার তদবির করেন। তিনি এও বলেন যে, তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষিত বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগে যোগদানের আবেদন করেছেন। এমতাবস্থায় কথিত মতে নাছোড়বান্দা জিয়ার অনুরোধের বিষয়টি তোফায়েল আহমেদ বঙ্গবন্ধুর কাছে বলেন এবং এই প্রক্রিয়ায় জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উল্লেখ্য, সামরিক বাহিনীর কতিপয় ওয়াকিবহাল কর্মকর্তা এ সম্পর্কে লিখেছেন, ওইদিন জিয়াউর রহমান অশ্রুভেজা কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, 'বুলেটে আমার বুক বিদীর্ণ হওয়ার আগে আপনার বুকে কোনো গুলি লাগতে দেবো না।' বঙ্গবন্ধু তাকে ডেপুটি চিফ অব আর্মি পদে বহাল রাখেন। এ প্রসঙ্গে পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'জিয়া তো ছোট মানুষ। মাঝেমধ্যে পাগলামি করে। আর একটু বয়স হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।' সেদিন যদি বঙ্গবন্ধু তাকে রাষ্ট্রদূত করে বিদেশে পাঠিয়ে দিতেন তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৫ আগস্টের মতো রক্তাক্ত ঘটনা ঘটানোর মতো সাহস কেউ পেত না। ৮. যে অন্যকে সম্মান করে তিনি সম্মানিত হন। বেগম জিয়া বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করলে তিনি ছোট হয়ে যাবেন না। বঙ্গবন্ধু কোনো দলের নয়। তিনি দলের ঊর্ধ্বে পুরো জাতির। ইতিহাস নির্দিষ্ট জাতি-রাষ্ট্রের পিতা। বাংলাদেশ নামটি তার দেওয়া। সেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন, নেতা হবেন সে ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে সম্মান প্রদর্শন করবেন না এটা আত্দপ্রতারণা, হীনরাজনীতি, যা জিয়াউর রহমান তার জীবিতকালে করেননি।
by Professor.Abu.Sayeed
প্রিয় ডট কম- প্রিয় ব্লগ
তথ্য সূত্রঃ http://blog.priyo.com/professor-abu-sayeed/42506.html