আজ গ্রেনেড হামলার সেই বিভীষিকাময় ২১ আগস্ট
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ আজ সেই ভয়াল বিভীষিকাময় রক্তাক্ত ২১ আগস্ট। বারুদ আর রক্তমাখা বীভৎস রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞের দিন। মৃত্যু-ধ্বংস-রক্তস্রোতের নারকীয় গ্রেনেড হামলার দশম বার্ষিকী। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ক্ষমতায় থাকাকালে সভ্যজগতের অকল্পনীয় এক নারকীয় হত্যাকা- চালানো হয় ২০০৪ সালের এই দিনে। গ্রেনেডের হিংস্র দানবীয় সন্ত্রাসে আক্রান্ত হয় মানবতা। রক্ত-ঝড়ের প্রচ-তায় মলিন হয়ে গিয়েছিল বাংলা ও বাঙালীর মুখ। জীবন্ত বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণ এদিন মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। বঙ্গবন্ধু হত্যার ঊনত্রিশ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে আবারও ঘাতকের দল এই আগস্টেই জোট বেঁধেছিল। শোকাবহ রক্তাক্ত আগস্ট মাসেই আরেকটি ১৫ আগস্ট ঘটানোর টার্গেট থেকে ঘাতক হায়েনার দল গ্রেনেড দিয়ে রক্তস্রোতের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সমাবেশস্থলে। টার্গেট ছিল এক ও অভিন্ন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নেতৃত্ব শূন্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করতেই ঘাতকরা চালায় এই দানবীয় হত্যাযজ্ঞ।
জাতির সামনে আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধস্পৃহা। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকার সময়ই খোদ রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে চালানো হয়েছিল এই ভয়াল ও বীভৎস গ্রেনেড হামলা। ওই সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেকেই যে এই নারকীয় হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল, তা তদন্তে জাতির সামনে প্রকাশ পেয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বিএনপি-জামায়াত জোটের অনেক কুশীলব এই হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কোন্ ভবনে বসে কারা এই হামলার নীলনক্সা তৈরি করেছিল তাও স্পষ্ট হয়েছে। জাতির প্রত্যাশা, ২১ আগস্টের হামলাকারী, পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও তাদের মদদদাতাদের সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দেশ থেকে হত্যা, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের চির অবসান করে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করা।
গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করতে সেদিন শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে চেয়েছিল ঘাতক চক্র। ঘাতকের গ্রেনেড হামলায় রীতিমতো রক্তগঙ্গা বইয়ে গিয়েছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের প্রাঙ্গণ। সন্ত্রাসবিরোধী আওয়ামী লীগের জনসভাকে ঘিরে কোলাহলপূর্ণ বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল বীভৎস মৃত্যুপুরীতে। সুপরিকল্পিত ও ঘৃণ্য এই গ্রেনেড হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত ও শোকাবহ আগস্টে আরেকটি ১৫ আগস্ট সৃষ্টির অপচেষ্টা করেছিল পরাজিত ঘাতক চক্র। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে হায়েনাদের হামলার ধরনও ছিল রক্তাক্ত ১৫ আগস্টের মতোই।
তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোটের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হীনচেষ্টা, হামলাকারীদের আড়াল করার লক্ষ্যে তদন্তের নামে নানা রকম টালবাহানায় এই ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। বিচার পাওয়ার আশা হয়ে ওঠে সুদূরপরাহত। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুনর্তদন্তে বেরিয়ে আসে বিএনপি-জামায়াত জোটের ঘৃণ্য মুখোশ। তৎকালীন হাওয়া ভবনে বসেই তারেক রহমানসহ বিএনপি-জামায়াতের মন্ত্রী-নেতারা যে এই ঘৃণ্য ও বীভৎস্য হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিল তা আজ স্পষ্ট। কিন্তু হামলার দশ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও খুনীদের বিচার না হওয়ায় কিছুটা হলেও ক্ষুব্ধ ও হতাশ ওই ভয়াল হামলায় নিহতদের পরিবার ও জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকা আহত নেতাকর্মীরা।
ভয়াল সেই হামলায় মৃত্যুজাল ছিন্ন করে প্রাণে বেঁচে গেলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হারিয়েছেন তাঁর দু’কানের স্বাভাবিক শ্রবণশক্তি। আহত পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী দেহে স্পিøন্টার নিয়ে, হাত-পা-চোখ হারিয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় অভিশপ্ত জীবন কাটাচ্ছেন। অসংখ্য নেতাকর্মীকে চিরদিনের জন্য বরণ করতে হয়েছে পঙ্গুত্ব, অন্ধত্ব। এই ভয়াল গ্রেনেড হামলা দশম বার্ষিকীতে নিহতদের পরিবার ও আহতরা দ্রুত এই কারুপুরুষোচিত হামলার নায়ক ও নেপথ্যের মদদদাতাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অভিন্ন কণ্ঠে দাবি উঠেছে- ঘাতকদের ফাঁসি চাই।
ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১এর বিশেষ এজলাসে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার চলছে। অতিরিক্ত সাক্ষী এবং আসামিদের অন্য মামলায় বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাওয়ার কারণে ২১ আগস্ট মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলছিল ধীরগতিতে। ইতোমধ্যে দশ বছর পেরিয়ে গেছে। মামলাটির বিচারকার্য শেষ হতে আরও কতদিন সময় লাগবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সরকারী কৌঁসুলিরাও। এ নিয়ে বিচারের প্রতীক্ষায় থাকা আহত ও নিহতদের পরিবারের স্বজনদের মাঝে চরম হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম নিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী ॥ ২১ আগস্ট উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ তাঁর বাণীতে বলেন, এ দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়, শোকাবহ দিন। এদিন বঙ্গবন্ধু তনয়া আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার নীলনক্সা অনুযায়ী ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট পরিকল্পিতভাবে ইতিহাসের বর্বরতম গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। আল্লাহর রহমতে সেই দিন শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও প্রাণ হারান গণতন্ত্রের আরেক লড়াকু সৈনিক আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী। তিনি বলেন, এ দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথ মসৃণ নয়। নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র এগিয়ে চলছে। দেশের গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতার পাশাপাশি পরমতসহিষ্ণুতা অপরিহার্য। আমার দৃঢ় বিশ্বাস দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে সকল রাজনৈতিক দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাণীতে বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, শান্তি ও উন্নয়নের ধারাকে স্তব্ধ করে দেয়া। এ ধরনের নারকীয় হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচার করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, সত্য কখনও চাপা থাকে না। তাই আজ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বিএনপি-জামায়াত জোটের অনেক কুশীলব এই হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কোন্ ভবনে বসে কারা এই হামলার নীলনক্সা তৈরি করেছিল তা স্পষ্ট হয়েছে। আমি আশা করি, ২১ আগস্টের হামলাকারী, পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও তাদের মদদদাতাদের সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দেশ থেকে হত্যা, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের চির অবসান হবে। আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।
কর্মসূচী ॥ দিবসটি শোকাবহ পরিবেশে পালনে নেয়া হয় নানা কর্মসূচী। হামলার স্থল আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বসানো হয়েছে সকল শহীদের প্রতিকৃতি দিয়ে তৈরি অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ। সেদিনের সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বড় বড় আলোকচিত্র লাগানো হয়েছে পুরো এলাকায়। বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউসহ আশপাশের এলাকায় নেয়া হয়েছে নিñিদ্র্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে আওয়ামী লীগের কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে হামলার সময় ৫টা ২২ মিনিটে অস্থায়ী বেদীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, নীরবতা পালন, অনুষ্ঠানস্থলে নিহতদের পরিবার ও আহতদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত।
এ ছাড়া ভয়াল ২১ আগস্ট স্মরণে আওয়ামী যুবলীগ প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিটে আলোক প্রজ্জ্বলন ও আলোচনাসভার আয়োজন করেছে। বিভিন্ন দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদদের স্মরণে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, কোরান খতমের আয়োজন করেছে। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এ সব সকল কর্মসূচী অনুরূপভাবে দেশব্যাপী দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোও পালন করবে।
ফ্লাশব্যাক ঃ ২১ আগস্ট ২০০৪ ॥ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। সেদিনটি ছিল শনিবার। বিকেলে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউয়ে সন্ত্রাস ও বোমা হামলার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সমাবেশ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। হাজার হাজার মানুষের স্রোত সমাবেশটিতে। সমাবেশ শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল হওয়ার কথা। তাই মঞ্চ নির্মাণ না করে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে একটি ট্রাককে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সমাবেশে অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যের পর শেখ হাসিনা বক্তব্য দিতে শুরু করেন।
সময় তখন বিকেল ৫টা ২২ মিনিট। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে বক্তৃতা শেষ করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে এগোতে থাকলেন ট্রাক থেকে নামার সিঁড়ির কাছে। মুহূর্তেই শুরু হলো নারকীয় গ্রেনেড হামলা। বিকল শব্দে বিস্ফোরিত হতে লাগল একের পর এক গ্রেনেড। আর জীবন্ত বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ মুহূর্তেই পরিণত হলো মৃত্যুপুরীতে। শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে খই ফোটার মতো একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় ঘাতকরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ১৩ গ্রেনেড হামলার বীভৎসতায় মুহূর্তেই রক্ত-মাংসের স্তুুপে পরিণত হয় সমাবেশস্থল। রক্তগঙ্গা বয়ে যায় এলাকাজুড়ে।
ঘাতকদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল শেখ হাসিনা। পরিস্থিতির তাৎপর্য বুঝতে ট্রাকে অবস্থানরত নেতৃবৃন্দ ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মানবঢাল রচনা করে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন বঙ্গবন্ধুর এই কন্যাকে। নেতা ও দেহরক্ষীদের আত্মত্যাগ ও পরম করুণাময়ের অশেষ রহমতে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আরেকটি রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট ঘটাতে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে উপর্যুপরি ১৩টি গ্রেনেড মেরেই ক্ষান্ত হয়নি ঘাতকরা; গ্রেনেডের আঘাতে পরাস্ত করতে না পেরে ওইদিন শেখ হাসিনার গাড়িতে ঘাতকরা ছুড়েছিল বৃষ্টির মতো গুলি। একেবারে পরিকল্পিত ও টার্গেট করা ঘাতকদের নিক্ষিপ্ত গুলি ভেদ করতে পারেনি শেখ হাসিনাকে বহনকারী বুলেটপ্রুফ গাড়ির কাঁচ। শেখ হাসিনাকে আড়াল করে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে জীবন বিলিয়ে দেন তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী ল্যান্স কর্পোরাল (অব) মাহবুবুর রশীদ। পরিকল্পিত হামলায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে শেখ হাসিনা ফিরে এলেও ওইদিন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় পুরো এলাকা। এই ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলার পর সেদিন স্পিন্টারের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন শত শত মানুষ।
জাতির সামনে আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধস্পৃহা। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকার সময়ই খোদ রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে চালানো হয়েছিল এই ভয়াল ও বীভৎস গ্রেনেড হামলা। ওই সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেকেই যে এই নারকীয় হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল, তা তদন্তে জাতির সামনে প্রকাশ পেয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বিএনপি-জামায়াত জোটের অনেক কুশীলব এই হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কোন্ ভবনে বসে কারা এই হামলার নীলনক্সা তৈরি করেছিল তাও স্পষ্ট হয়েছে। জাতির প্রত্যাশা, ২১ আগস্টের হামলাকারী, পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও তাদের মদদদাতাদের সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দেশ থেকে হত্যা, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের চির অবসান করে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করা।
গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করতে সেদিন শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে চেয়েছিল ঘাতক চক্র। ঘাতকের গ্রেনেড হামলায় রীতিমতো রক্তগঙ্গা বইয়ে গিয়েছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের প্রাঙ্গণ। সন্ত্রাসবিরোধী আওয়ামী লীগের জনসভাকে ঘিরে কোলাহলপূর্ণ বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল বীভৎস মৃত্যুপুরীতে। সুপরিকল্পিত ও ঘৃণ্য এই গ্রেনেড হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত ও শোকাবহ আগস্টে আরেকটি ১৫ আগস্ট সৃষ্টির অপচেষ্টা করেছিল পরাজিত ঘাতক চক্র। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে হায়েনাদের হামলার ধরনও ছিল রক্তাক্ত ১৫ আগস্টের মতোই।
তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোটের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হীনচেষ্টা, হামলাকারীদের আড়াল করার লক্ষ্যে তদন্তের নামে নানা রকম টালবাহানায় এই ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। বিচার পাওয়ার আশা হয়ে ওঠে সুদূরপরাহত। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুনর্তদন্তে বেরিয়ে আসে বিএনপি-জামায়াত জোটের ঘৃণ্য মুখোশ। তৎকালীন হাওয়া ভবনে বসেই তারেক রহমানসহ বিএনপি-জামায়াতের মন্ত্রী-নেতারা যে এই ঘৃণ্য ও বীভৎস্য হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিল তা আজ স্পষ্ট। কিন্তু হামলার দশ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও খুনীদের বিচার না হওয়ায় কিছুটা হলেও ক্ষুব্ধ ও হতাশ ওই ভয়াল হামলায় নিহতদের পরিবার ও জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকা আহত নেতাকর্মীরা।
ভয়াল সেই হামলায় মৃত্যুজাল ছিন্ন করে প্রাণে বেঁচে গেলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হারিয়েছেন তাঁর দু’কানের স্বাভাবিক শ্রবণশক্তি। আহত পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী দেহে স্পিøন্টার নিয়ে, হাত-পা-চোখ হারিয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় অভিশপ্ত জীবন কাটাচ্ছেন। অসংখ্য নেতাকর্মীকে চিরদিনের জন্য বরণ করতে হয়েছে পঙ্গুত্ব, অন্ধত্ব। এই ভয়াল গ্রেনেড হামলা দশম বার্ষিকীতে নিহতদের পরিবার ও আহতরা দ্রুত এই কারুপুরুষোচিত হামলার নায়ক ও নেপথ্যের মদদদাতাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অভিন্ন কণ্ঠে দাবি উঠেছে- ঘাতকদের ফাঁসি চাই।
ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১এর বিশেষ এজলাসে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার চলছে। অতিরিক্ত সাক্ষী এবং আসামিদের অন্য মামলায় বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাওয়ার কারণে ২১ আগস্ট মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলছিল ধীরগতিতে। ইতোমধ্যে দশ বছর পেরিয়ে গেছে। মামলাটির বিচারকার্য শেষ হতে আরও কতদিন সময় লাগবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সরকারী কৌঁসুলিরাও। এ নিয়ে বিচারের প্রতীক্ষায় থাকা আহত ও নিহতদের পরিবারের স্বজনদের মাঝে চরম হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম নিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী ॥ ২১ আগস্ট উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ তাঁর বাণীতে বলেন, এ দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়, শোকাবহ দিন। এদিন বঙ্গবন্ধু তনয়া আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার নীলনক্সা অনুযায়ী ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট পরিকল্পিতভাবে ইতিহাসের বর্বরতম গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। আল্লাহর রহমতে সেই দিন শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও প্রাণ হারান গণতন্ত্রের আরেক লড়াকু সৈনিক আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী। তিনি বলেন, এ দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথ মসৃণ নয়। নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র এগিয়ে চলছে। দেশের গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতার পাশাপাশি পরমতসহিষ্ণুতা অপরিহার্য। আমার দৃঢ় বিশ্বাস দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে সকল রাজনৈতিক দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাণীতে বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, শান্তি ও উন্নয়নের ধারাকে স্তব্ধ করে দেয়া। এ ধরনের নারকীয় হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচার করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, সত্য কখনও চাপা থাকে না। তাই আজ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বিএনপি-জামায়াত জোটের অনেক কুশীলব এই হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কোন্ ভবনে বসে কারা এই হামলার নীলনক্সা তৈরি করেছিল তা স্পষ্ট হয়েছে। আমি আশা করি, ২১ আগস্টের হামলাকারী, পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও তাদের মদদদাতাদের সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দেশ থেকে হত্যা, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের চির অবসান হবে। আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।
কর্মসূচী ॥ দিবসটি শোকাবহ পরিবেশে পালনে নেয়া হয় নানা কর্মসূচী। হামলার স্থল আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বসানো হয়েছে সকল শহীদের প্রতিকৃতি দিয়ে তৈরি অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ। সেদিনের সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বড় বড় আলোকচিত্র লাগানো হয়েছে পুরো এলাকায়। বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউসহ আশপাশের এলাকায় নেয়া হয়েছে নিñিদ্র্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে আওয়ামী লীগের কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে হামলার সময় ৫টা ২২ মিনিটে অস্থায়ী বেদীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, নীরবতা পালন, অনুষ্ঠানস্থলে নিহতদের পরিবার ও আহতদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত।
এ ছাড়া ভয়াল ২১ আগস্ট স্মরণে আওয়ামী যুবলীগ প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিটে আলোক প্রজ্জ্বলন ও আলোচনাসভার আয়োজন করেছে। বিভিন্ন দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদদের স্মরণে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, কোরান খতমের আয়োজন করেছে। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এ সব সকল কর্মসূচী অনুরূপভাবে দেশব্যাপী দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোও পালন করবে।
ফ্লাশব্যাক ঃ ২১ আগস্ট ২০০৪ ॥ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। সেদিনটি ছিল শনিবার। বিকেলে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউয়ে সন্ত্রাস ও বোমা হামলার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সমাবেশ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। হাজার হাজার মানুষের স্রোত সমাবেশটিতে। সমাবেশ শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল হওয়ার কথা। তাই মঞ্চ নির্মাণ না করে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে একটি ট্রাককে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সমাবেশে অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যের পর শেখ হাসিনা বক্তব্য দিতে শুরু করেন।
সময় তখন বিকেল ৫টা ২২ মিনিট। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে বক্তৃতা শেষ করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে এগোতে থাকলেন ট্রাক থেকে নামার সিঁড়ির কাছে। মুহূর্তেই শুরু হলো নারকীয় গ্রেনেড হামলা। বিকল শব্দে বিস্ফোরিত হতে লাগল একের পর এক গ্রেনেড। আর জীবন্ত বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ মুহূর্তেই পরিণত হলো মৃত্যুপুরীতে। শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে খই ফোটার মতো একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় ঘাতকরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ১৩ গ্রেনেড হামলার বীভৎসতায় মুহূর্তেই রক্ত-মাংসের স্তুুপে পরিণত হয় সমাবেশস্থল। রক্তগঙ্গা বয়ে যায় এলাকাজুড়ে।
ঘাতকদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল শেখ হাসিনা। পরিস্থিতির তাৎপর্য বুঝতে ট্রাকে অবস্থানরত নেতৃবৃন্দ ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মানবঢাল রচনা করে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন বঙ্গবন্ধুর এই কন্যাকে। নেতা ও দেহরক্ষীদের আত্মত্যাগ ও পরম করুণাময়ের অশেষ রহমতে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আরেকটি রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট ঘটাতে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে উপর্যুপরি ১৩টি গ্রেনেড মেরেই ক্ষান্ত হয়নি ঘাতকরা; গ্রেনেডের আঘাতে পরাস্ত করতে না পেরে ওইদিন শেখ হাসিনার গাড়িতে ঘাতকরা ছুড়েছিল বৃষ্টির মতো গুলি। একেবারে পরিকল্পিত ও টার্গেট করা ঘাতকদের নিক্ষিপ্ত গুলি ভেদ করতে পারেনি শেখ হাসিনাকে বহনকারী বুলেটপ্রুফ গাড়ির কাঁচ। শেখ হাসিনাকে আড়াল করে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে জীবন বিলিয়ে দেন তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী ল্যান্স কর্পোরাল (অব) মাহবুবুর রশীদ। পরিকল্পিত হামলায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে শেখ হাসিনা ফিরে এলেও ওইদিন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় পুরো এলাকা। এই ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলার পর সেদিন স্পিন্টারের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন শত শত মানুষ।
তথ্য সূত্রঃ দৈনিক জনকণ্ঠ
http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=15&dd=2014-08-21&ni=182666